শুক্রবার, জানুয়ারি ১৮, ২০১৯, ৬:৪০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
Home » শিক্ষা » ১০ বছরে শিক্ষায় রেকর্ড সাফল্য

১০ বছরে শিক্ষায় রেকর্ড সাফল্য

 

বিলকিস বানু, রাজধানীর কলাবাগানের লাল ফকিরের গলি বস্তির বাসিন্দা। বিভিন্ন বাসায় কাজের বুয়ার কাজ করেন। তার একার রোজগারে সংসার না চলায় ৮ বছর বয়সী মেয়ে মরিয়মকেও অন্যের বাসায় কাজে পাঠাতেন। একদিন তিনি জানতে পারেন স্কুলে গেলে টাকা দেয়, খাবারও দেয়। একথা জানার পর মেয়েকে গ্রামে পাঠিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দেন। মরিয়ম এ বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা দেবে। স্কুলে উপবৃত্তি ও দুপুরের টিফিন প্রদানের ফলে শুধু মরিয়ম নয় মরিয়মের মতো এমন হাজারো শিশুর জীবন বদলে গেছে গত ১০ বছরে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-২০১০ থেকে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে প্রাথমিক, ইবতেদায়ী, জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায় পর্যন্ত ২ কোটি ৮৯ লাখ ৮ হাজার ৯২১ জন শিক্ষার্থীকে ৫ হাজার ৩১৩ কোটি ৩০ লাখ ৯০ হাজার টাকা উপবৃত্তিসহ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাবৃদ্ধি, ঝরেপড়া রোধ, শিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ রোধ, নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থ সামাজিক উন্নয়নে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিসহ শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রী সমতা বিধানের লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় উপবৃত্তি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পসমূহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা অনলাইনে প্রদান করছে।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের লেখা ‘শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়ন (২০০৯-২০১৮)’ শীর্ষক বইয়ে গত ১০ বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকটি অর্জনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। অর্জনগুলো হলো- জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। জেএসসি, জেডিডি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মাথায় ফল প্রকাশ করা হয়েছে। গত সাড়ে ৯ বছরে একবারও এর ব্যতায় হয়নি। শিক্ষার উন্নয়নে যুগোপযুগী পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টি মিডিয়া ক্লাস মনিটরিং এর উদ্দেশ্যে অনলাইনে ড্যাশ বোর্ড চালু করা হয়েছে। বইটিতে গত ১০ বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জনগুলোতে, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যলায় ও উচ্চ শিক্ষা এসব ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে।

প্রাক প্রাথামিক ও প্রথামিকে অর্জন: সকল শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা গ্রহণের ফলে প্রায় ৯৯ শতাংশ শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। ১০০ শতাংশ শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার জোর প্রচেষ্টা চলছে। প্রতিবছর ১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক দিবস উদযাপন করা হয়ে থাকে। এ দিন সারা বাংলাদেশে একযোগে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে পূর্ণসেট পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২৬০ কোটি ৮৬ লাখ ৯১ হাজার ২৯০ কপি পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সর্বপ্রথম প্রাক-প্রাথমিক স্তুরে ৫টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৮২ হাজার ৮৯৬ জন শিক্ষার্থীর মাঝে নিজ নিজ মাতৃভাষায় মুদ্রিত ২ লাখ ২৬ হাজার ৫৫৯ টি পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে অর্জন: প্রায় ২৭ বছর পর ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও পরিমার্জন করা হয় এবং নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আইসিটি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ৪৪টি বিষয়ে নতুন ও পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন পাঠ্যক্রম অনুসারে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ৩৪০টি পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়েছে। মুখস্থ ও নোট গাইড বই নির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব আনাসহ উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চ শিক্ষা: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ প্রণীত ও বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে এবং ৫০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে আরও ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বর্তমানে দেশে ৪৮টি পাবলিক ও ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ১৫১টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৪২টি পাবলিক ও ৯২টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ১৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয় চালু রয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংকের সাথে যৌথ অর্থায়নে দুই হাজার ৫৪ কোটি ৩২ লাখ টাকার উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্প (হেকেপ) বাস্তবায়ন চালু রয়েছে।

আইসিটি শিক্ষা: কয়েক বছর আগেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা জানত না ল্যাপটপ বা কম্পিউটার কী। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যকর করতে গ্রাম ও শহরে নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩২ হাজার ৬৬৭টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। ফলে শুধু শহর নয় গ্রামের শিক্ষার্থীরাও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মাধ্যমে পড়ালেখা করছে। এছাড়া সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ)-এর আওতায় মাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটির ব্যবহার নিশ্চিতকরণে ৬৪ জেলায় ৬৪০ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি লার্নিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, আজ আমাদের জিডিপি বেড়েছে, রেমিটেন্স বেড়েছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্জন সম্ভব হয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে বলেই। শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের কারণে আমাদের সব দিকে উন্নয়ন হয়েছে।

গত কয়েক বছরে বড় অর্জন কারিগরি খাতে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাওয়া উল্লেখ করে মিজানুর রহমান বলেন, আগে এ খাতে আমাদের অর্জন ছিল ১ শতাংশ। বর্তমানে এটি ১৫ শতাংশ। এটি অভূতপূর্ব অর্জন। কারিগরিতে যতো শিক্ষার্থী বাড়বে আমাদের উন্নয়ন ততো ত্বরান্বিত হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি আসাদুল হক বলেন, গত ১০ বছরে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি প্রণয়ন। নকল বন্ধে এ সরকার সফলতা দেখালেও তা কিছুটা ম্লান করে দেয় প্রশ্নফাঁস। তবে এখন প্রশ্নফাঁসও কঠোর হাতে দমন করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য আমাদের আর পাশের দেশে যেতে হয় না, এটাও বড় অর্জন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *