বৃহস্পতিবার, মার্চ ২১, ২০১৯, ২:১৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ
Home » অন্যান্য » রাষ্ট্র ভাষা বাংলার জন্য জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমে ছিলেন ভাষা সৈনিক একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রতিভা মুৎসুদ্দি

রাষ্ট্র ভাষা বাংলার জন্য জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমে ছিলেন ভাষা সৈনিক একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রতিভা মুৎসুদ্দি

মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল, স্টাফ রিপোর্টারঃ-
আগামীকাল মহান অমর একুশে ।৫২ ভাষা আন্দোলন,৬৬ সালের ৬ দফা,৬৯ এর গণঅভ্যুথান, ৭০ এর নির্বাচন ও ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যে কয়েক জন নারী মুক্তির জন্য কাজ করেছেন তাদের একজন হলেন একজন প্রতিভাময়ী নারী ভাষা সৈনিক ও নানা গুনে গুনান্মিত প্রতিভা মুৎসুদ্দি।বয়সের ভ্যারে নুজ্য হয়ে গেলেও মানব সেবা,নারী মুক্তি, নারী আন্দোলন ও শিক্ষার উন্নয়নে এখনও কাজ করে যাচ্ছেন।তিনি বলেন ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের মাতৃভাষার মুক্তির দিন। ভাষা সংগ্রমে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অবদানও অনেক। কিন্তু এখনো বাংলা ভাষার সর্বত্র প্রচলন না হওয়ায় কষ্ট পান ভাষা সৈনিকরা। তাদের মধ্যে একজন প্রবীণ ভাষা সৈনিক একুশে পদক প্রাপ্ত প্রতিভা মুৎসুদ্দি। ১৯৩৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্রগ্রামের জন্ম নেন এই ভাষা সৈনিক। ছোটবেলায় তার স্কুল জীবন শুরু হয় গ্রামের মহামুনী এ্যাংলো পালি ইনষ্টিটিউশনস এর মাধ্যমে। চট্রগ্রামের মেয়ে হলেও প্রতিভা মুৎসুদ্দি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের মানুষের একান্ত আপনজন সবার বড় মা হিসেবে পরিচিত।
আজ বুধবার গুনী এই ভাষা সৈনিকের সঙ্গে কথা হয় ৫২ ভাষা আন্দোলন ও দেশ্রে স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে।তিনি বলেন জাতির জনক ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জিত হয়ে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার যুদ্ধসহ সব আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিয়ে ছিলাম। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের কথা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৪৮ সালে গ্রামের স্কুলে থাকা কালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন বক্তৃতা করছিলেন “উর্দু উর্দু ও শুধু উর্দুই হবে পাকিস্তানের এক মাত্র রাষ্টভাষা” এ অন্যায় ঘোষণার প্রতিবাদে না, না, না, বলে ফেটে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা। চট্টগ্রামের কবি ও সাহিত্যিক ভাষা সৈনিক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম কমিটি গড়ে ওঠে। আমি তখন অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রী। সেই সময় যে সব জেঠাত ভাইয়েরা সব বামপন্থি ছাত্র রাজনীতি করত যার কারনে ভাষা আন্দোলনে ঝুকে পড়ি। ১৯৫১ সালে চট্রগ্রামের ডাঃ খাস্তগীর স্কুল থেকে এসএসসি পাশের পর চট্রগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়। ১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ™ি^তীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলাম। ভাষার দাবিতে আমি মাহবুবুল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ ছাত্র সমাজের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেই। পোস্টার লিখি, অভিভাবকদের বাধাকে উপেক্ষা করে মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে নামি। চট্টগ্রাম রাষ্ট্রভাষা কমিটির আহ্বায়ক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর আহ্বানে ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে ধর্মঘট পালন, মিছিল ও লাল দিঘীর ময়দানে সভায় অংশ নেই।
১৯৫৪ সালে চট্রগ্রাম কলেজ থেকে অর্থনীতিতে সম্মান প্রথম বর্ষ শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িয়ে পড়ি। এরপর ভাষা সৈনিকরা আন্দোলনের নানা কর্মসূচি পালন করতে করতে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী শহীদ মিনারে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রবেশ করতে না দেয়ার খবর পেয়ে প্রতিভা মুৎসুদ্দি ৫-৬ জন ছাত্রীকে সাথে নিয়ে শহীদ মিনারে ছুটে যাই, হঠাৎ পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। তখন লাইব্রেরীতে পালানো ছারা আর কোন উপায় ছিলনা প্রতিভা ও তার সঙ্গীদের। পরে বিকেলে তারা লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে আর তখনি তারা স্লেগান দেয় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। পুলিশ প্রতিভা মুৎসুদ্দিসহ আরো ৬-৭ জনকে গ্রফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।৭-৮ দিন পর তারা কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর তিনি ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৬ পর্য়ন্ত ঢাকা বিশবিদ্যালয় মহিলা মিলনায়তন সম্পাদিকা এবং ১৯৫৭ সালে উইমেন্স হলের (বর্তমান রোকেয়া হল) প্রথম সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৯ সালে অর্থনীতিতে মাষ্টার্স ডিগ্রী, ১৯৬০ সালে ময়মনসিংহ মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি, এড ডিগ্রী লাভ করার পরে কক্সবাজার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন এবং পরে ১৯৬১ সালে গাজীপুর জেলা সদর সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে চলে আসেন। এখানে কিছু দিন চাকুরী করার পর ১৯৬৩ সালে তিনি দানবীর রনদা প্রসাদ সাহার ভারতেশ্বরী হোমসে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন।তার সততা, নিষ্ঠা ও মহানুভবতার জন্য পুরষ্কার হিসেবে পরবতীর্তে ১৯৬৫ সালে ভারতেশ^রী হোমসের অধ্যক্ষার দায়িত্ব পান। দীর্ঘ ৩৪ বছর পর ১৯৯৯ সালে তিনি অবসর গ্রহন করলে তাকে কুমুদিনী কল্যান সংস্থার পরিচালক এবং ভারতেশ্বরী হোমসের শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব দেয়া হয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি ২০০১ সালে একুশে পদক পান। একুশে পদক ছাড়াও ১৯৮৭ সালে বেইস এর আজিজুর রহমান পাটোয়ারী পদক, ১৯৯৫ সালে অনন্যা শীর্ষ দশ পদক, ১৯৯৬ সালে লায়ন নজরুল ইসলাম শিক্ষা স্বর্নপদক, ১৯৯৮ সালে দ্যা রোটারি ফাউন্ডেশনে অব রোটারি ইন্টারন্যাশনাল এর পল হ্যারিস ফেলো পদক, ২০০০ সালে বৌদ্ধ একাডেমী পুরস্কার এবং ২০০৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড মিশনের ধমর্ বীর পদক ও ২০০৬ সালে বিশ্যুদানন্দ স্বর্নপদকসহ বিভিন্ন পদকে ভূষিত হয়েছেন এই মহূয়সী নারী ভাষা সৈনিক।
তিনি আরো বলেন, দেশের সর্বক্ষেত্রে শুদ্ধবাংলা ভাষার প্রচলন আরো ব্যাপক ভাবে হওয়া উচিত। যুব সম্প্রদায় ছাড়া এ উন্নতি সম্ভব নয়। ভাষা আন্দোলনের ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও দেশে অনেক জীবিত ও মৃত ভাষা সৈনিকরা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অপরিচিত। তাদের পরিচিতির জন্য সরকারি ও বেসরকারি হস্তক্ষেপের একান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *