মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৭, ২:০৬:২৮ অপরাহ্ণ
Home » সম্পাদকীয় » ভুয়া জামিননামায় কারামুক্তি!

ভুয়া জামিননামায় কারামুক্তি!

অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগের ভয়ঙ্কর আসামি মিজান মাতুব্বর জামিননামা দাখিল করে কারাগার থেকে বের হয়ে গেছে। অথচ বাস্তবতা হল তার আদৌ জামিনই হয়নি। এটি শিউরে ওঠার মতো ঘটনা হলেও বিচারকদের দেয়া জামিননামা জাল করে ভয়ঙ্কর অপরাধী-সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি অন্যান্য আসামির কারাগার থেকে বের হয়ে পালিয়ে যাওয়া এই প্রথম নয়। জানা যায়, ডাকযোগে বা আদালতের পত্রবাহক মারফত জামিননামা কারাগারে পাঠানোর বিধান থাকলেও সেটি মানা হচ্ছে না। অন্য কর্মচারী, এমনকি এক আদালতের পত্রবাহকের পরিবর্তে অন্য আদালতের কর্মচারীর মাধ্যমেও কারাগারে পাঠানো হচ্ছে জামিননামা।
ফলে নানা কারসাজির মাধ্যমে জামিননামা নকল করে বের হয়ে যাচ্ছে আসামিরা। বলার অপেক্ষা রাখে না, ন্যায়বিচার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এ ধরনের অপকর্ম যে কোনো মূল্যে বন্ধ করার বিকল্প নেই। রেজিস্ট্রি ডাক বা আদালতের নিজস্ব পত্রবাহকের মাধ্যমে না পাঠিয়ে ভিন্ন উপায়ে জামিননামা পাঠানোর রেওয়াজ গড়ে ওঠায় ভুয়া ও জাল জামিননামা তৈরি করে দাগি আসামিদের কারাগার থেকে বের করে নেয়ার মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হতে পারছে। এমন অপকর্ম বন্ধে কেবল রেজিস্ট্রি ডাক ও নিজস্ব বার্তাবাহকের মাধ্যমে জামিননামা পাঠানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রয়োজনে আদালত মেইলের মাধ্যমে জামিননামার স্ক্যান অনুলিপি ও জামিন পাওয়া ব্যক্তির ছবি কারাগারে পাঠানোর উদ্যোগ নিতে পারে। এতে সময় ও অর্থের অপচয় যেমন কমানো যাবে, তেমনই কম লোকবল দিয়ে বেশি কাজ করা সম্ভব হবে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে তা ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া প্রতিটি আদালতের ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট বিচারক থেকে শুরু করে বার্তাবাহক পর্যন্ত সবার ছবি আপলোড করার ব্যবস্থা থাকা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। উপরে উল্লিখিত জামিন জালিয়াতির ঘটনায় কারাগার কর্তৃপক্ষ বলছে কে আদালতের পত্রবাহক সেটা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জানানো হয় না। এমনকি একেক সময় একেকজন বার্তা নিয়ে আসেন। এক্ষেত্রে ওয়েবসাইট থেকে ছবি মিলিয়ে নিয়ে বার্তাবাহকের কাছ থেকে জামিননামা গ্রহণ করা হলে জামিন জালিয়াতির ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।
দেশে জামিন জালিয়াতি কত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তা ২০১৫ সালের একটি ঘটনাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ওই বছর ঢাকার বিভিন্ন আদালতের ৭৬টি মামলার ১০৬ আসামিকে কারসাজি করে মুক্ত করে নেয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় হাইকোর্টের বিচারকদের স্বাক্ষর জাল করে আসামির জামিনের খবরও এসেছে। মিজান মাতুব্বরের জামিননামা দাখিলকারীর দেয়া স্বাক্ষরটিও জাল। এমনকি যিনি সেটা দাখিল করেছেন তিনিও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের কর্মচারী নন, তিনি ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের নাইটগার্ড। এ থেকে সহজেই অনুমেয়, বিভিন্ন আদালতের কর্মচারীদের মধ্যে যোগসাজশে জামিন জালিয়াতি ও আসামি বের করে নেয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে আদালতকে যেমন সতর্ক হতে হবে, তেমনই সেগুলো গ্রহণের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে জেল কর্তৃপক্ষকেও। সব পক্ষের সচেতনতার পাশাপাশি ডিজিটালাইজেশনে জোর দেয়া হলে জালিয়াতি-কারসাজি বন্ধ হবে বলে আশা করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *