শনিবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৮, ১১:৩৬:৩৫ অপরাহ্ণ
Home » সারাদেশ » খুলনা » কুষ্টিয়ার মাঠজুড়ে শুধু তামাক আর তামাকের চাষ

কুষ্টিয়ার মাঠজুড়ে শুধু তামাক আর তামাকের চাষ

জাহাঙ্গীর হোসেন জুয়েল কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় ব্যপকহারে বেড়েছে তামাক চাষ। জেলায় প্রায় ৫০ ভাগ জমিতে তামাকের আবাদ হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের গাফলতি, কর্তব্য অবহেলার কারণে এবার কুষ্টিয়ায় তামাকের চাষে ঝুকে পড়ছে কৃষকরা। বিএডিসির সেচ স্কীমগুলোতেও ব্যাপক হারে তামাক চাষ হচ্ছে। বিগত বছর গুলোতে তামাক চাষে অধিক লাভবান হওয়ায় এবং কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদেও উদাসীনতা চাষীদের তামাক চাষে উৎসাহিত করে তুলছে। এ সুযোগে তামাক উৎপাদনে সংশি¬ষ্ট কোম্পানি গুলো কৃষকের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে¬। অন্য দিকে খাদ্যশষ্য উৎপাদনের জমি অধিকহারে তামাক চাষে ব্যবহৃত হওয়ায় এবার বোরোর আবাদ কম হওয়ায় কুষ্টিয়ায় মারাতœক খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
দেশের অন্যতম তামাক উৎপাদনকারী এলাকার মধ্যে কুষ্টিয়া অন্যতম, এখানকার উৎপাদিত তামাক উৎকৃষ্ট মানের হওয়ায় বড় বড় তামাক উৎপাদনকারী, প্রক্রিয়াজাতকারী, বিড়ি,সিগারেট প্রস্ততকারী কোম্পানীগুলো এই এলাকায় জেঁকে বসেছেন। মাঠের পর মাঠ শুধু তামাকের চাষ হলেও এর সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই খোদ কৃষি অফিসে।
তবে, জেলা কৃষি স¯প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুষ্টিয়া জেলায় সর্বমোট আবাদি জমির পরিমান ১ লক্ষ ১৫ হাজার ৯৭৮হেক্টর। এর মধ্যে গত মৌসুমে বোরো ধান আবাদ হয়েছিল প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫২ হেক্টর। গম ১১ হাজার ১৩০ হেক্টরে, ভুট্টা ২০ হাজার ৯০০ হেক্টর, আলু ২ হাজার ৮০৬ হেক্টরে, মিষ্টি আলু ৩৬৪ হেক্টরে, সরিষা ৬ হাজার ৬৯০ হেক্টরে,সবজি ৬ হাজার ২২৫ হেক্টর এবং ১৩ হাজার ২৭৬ হেক্টরে তামাক চাষ হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হলেও তামাক কোম্পানীগুলোর তথ্যমতে, তামাকের চাষ হয়েছিল প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে।
তামাক উৎপাদনকারী কোম্পানীগুলোর ঘনিষ্ট সুত্র মতে, এ বছর কুষ্টিয়া অঞ্চলে আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানি প্রায় ৯ হাজার হেক্টর, ঢাকা টোব্যাকো ১৫ হাজার হেক্টর, জামিল টোব্যাকো ১২শ হেক্টর এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে আরো ৮ হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হচ্ছে যা মোট আবাদি জমির অধের্কের বেশি।
সরকার তামাক চাষে ভুর্তুকী না দিলেও তামাক উৎপাদনকারী কোম্পানীগুলো তাদের সুপারভাইজারদের মাধ্যমে নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারী মাসের সমুদয় সার বি,সি,আই,সি ডিলারদের কাছ থেকে গোপনে কিনে নিয়েছে বলে সংশি¬ষ্ট একাধিক সুত্র জানিয়েছে, কারণ, এই সময়ে অন্যান্য ফসলে সারের চাহিদা নেই, একাজে সার ডিলারদের তদারকি কর্মকর্তার হাত আছে বলে ঐ সুত্র দাবী করে। কৃষকদের ভুর্তুকির সার তামাক চাষে ব্যবহৃত হওয়ায় সরকারের বিপুল পরিমান অর্থ গচ্ছা যাচ্ছে বলে কৃষকবোদ্ধারা জানিয়েছেন।
এদিকে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা কুষ্টিয়ার বৃহত্তর দৌলতপুর উপজেলায়। এই উপজেলায় ৩৩ হাজার হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হচ্ছে। পদ্মার পাড়ে ৪টি চরাঞ্চল ইউনিয়নে সম্পুণরুপে তামাক চাষ হচ্ছে যা অকল্পনীয়। এখানকার জমির বর্গা মূল্য এমনই যে শুধু মাত্র তামাক চাষকালীন সময়ের জন্য প্রতি বিঘা জমি ১৪/১৫ হাজার টাকায় ভাড়া দেয়া হচ্ছে। এখানকার কৃষি অফিসের ব্লক সুপারভাইজার বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নামকাওয়াস্তে তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করার কথা না বললেও তারা খাতাপত্র ঠিক রাখেন। এভাবে যদি কৃষি বিভাগ উদাসীনতা দেখায় তাহলে সাধারণ চাষিদের তামাক চাষ করা ছাড়া আর উপায় কি?
অন্যদিকে এক বিঘা জমিতে তামাক চাষে বীজ,সার,কীটনাশক ও পরিচর্যাসহ মোট ব্যয় হয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা যা তামাক উৎপাদনকারী কোম্পানি স¤পূর্ণ বহন করে একারণে সাধারণ চাষীরা তামাক চাষে আসক্ত হয়ে পড়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ডঃ গোলাম মর্তুজা বলেন, এমন একটা সময় আসবে যখন তামাক চাষের ফলে কুষ্টিয়ায় আর কোন ফসলের চাষ করা সম্ভব হবেনা। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং খাদ্য জাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এখনই তামাকের চাষ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এ অঞ্চলে তামাক চাষ বৃদ্ধির ধারা যেভাবে উর্ধমুখী হচ্ছে, এরফলে অদুর ভবিষ্যতে কুষ্টিয়ায় চরম খাদ্য সংকট দেখা দিবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *