সোমবার, অক্টোবর ২২, ২০১৮, ১২:১৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ
Home » আন্তর্জাতিক » কনস্যুলেটের ভেতরে সৌদি যুবরাজের সমালোচককে হত্যা?

কনস্যুলেটের ভেতরে সৌদি যুবরাজের সমালোচককে হত্যা?

অনলাইন ডেস্ক
বান্ধবীকে বাইরে দাঁড? করিয়ে রেখে মঙ্গলবার দুপুরে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে ঢুকেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল তার বিবাহ-বিচ্ছেদের একটা সার্টিফিকেট নেয়া। তার পর থেকেই জামাল খাসোগি নিখোঁজ। ওই ঘটনার ছয়দিন পর তুরস্কের পুলিশ বলছে, জামাল খাগোসিকে হয়তো কনস্যুলেটের ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অন্যতম প্রধান সমালোচক হচ্ছেন এই ৫৯ বছর বয়স্ক জামাল খাসোগি।
তিনি আল-ওয়াতান পত্রিকা ও সৌদি টিভির সাবেক সম্পাদক ছিলেন। তিনি সৌদি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং ঊর্ধ্বতন সৌদি কর্মকর্তাদের উপদেষ্ট ছিলেন। কিন্তু কয়েকজন বন্ধুকে গ্রেফতার করার পর আল-হায়াত পত্রিকায় তার কলামটি বন্ধ করে দেয়া হয় এবং টুইট করা বন্ধ করতে সতর্ক করে দেয়া হয়।
এরপর জামাল খাসোগি সৌদি আরব ছেড?ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং সেখান থেকে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছিলেন ও বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন।
সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী জামাল খাসোগির রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়া নিয়ে পাশ্চাত্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যমে গত কয়েকদিন ধরেই তুমুল হইচই চলছিল, কিন্তু এখন তা পুরোদস্তুর হত্যা রহস্যে রূপ নিয়েছে।
ঘটনার শুরু গত মঙ্গলবার। খাসোগির হাতিস চেঙ্গিজ নামে এক তুর্কি নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। হাতিসকে নিয়েই তিনি ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেট ভবনে এসেছিলেন। বান্ধবীকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে জামাল খাসোগি কনস্যুলেটের ভেতরে যান। কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি।
জামাল খাসোগি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের একজন সমালোচক এবং বেশ কিছুকাল ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন।
তার কনস্যুলেটে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, পূর্বতন স্ত্রীকে তিনি ডিভোর্স (তালাক) দিয়েছেন— এ মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র নেয়া, যাতে তিনি হাতিসকে বিয়ে করতে পারেন।
খাসোগি তার মোবাইল ফোনটি হাতিসের হাতে দিয়ে ভবনের ভেতরে ঢোকেন। হাতিস সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কনস্যুলেটে ঢোকার সময় খাসোগি বিমর্ষ এবং মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন, কারণ তাকে ওই ভবনে ঢুকতে হচ্ছে।
হাতিস আরো বলেন, জামাল খাসোগি তাকে বলেছিলেন— যদি তিনি কনস্যুলেট থেকে বের না হন তাহলে তিনি (হাতিস) যেন তুরস্কের প্রেসিডেন্টের একজন উপদেষ্টাকে ফোন করেন।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান— বিবিসি
হাতিস জানান, তিনি কনস্যুলেটের বাইরে অপেক্ষা করেন মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুর একটা থেকে মধ্যরাতের পর পর্যন্ত। কিন্তু তিনি জামাল খাসোগিকে কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেননি। বুধবার সকালবেলা কনস্যুলেট খোলার সময় তিনি আবার সেখানে উপস্থিত হন। তখন পর্যন্ত খাসোগির কোনো খোঁজ তো মেলেইনি, এখনো তিনি নিরুদ্দেশ।
খাসোগিকে পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে কনস্যুলেটের ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে— প্রাথমিকভাবে এমনটাই ধারণা তুরস্কের পুলিশের। শুধু তাই নয়, শনিবার দুই অজ্ঞাতনামা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তুর্কি সংবাদমাধ্যম ও রয়টার্স প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে, খাসোগির মৃতদেহ কনস্যুলেট থেকে বের করেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
যদিও খাগোসিকে হত্যা করা হয়েছে— এমন ধারণার পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি তুর্কি পুলিশ এবং সৌদি কর্মকর্তারা একে ভিত্তিহীন বলে উড?িয়ে দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট একটি সূত্র উদ্ধৃত করে বলেছে, খাসোগিকে হত্যা করতে ১৫ জনের একটি বিশেষ দল পাঠানো হয়েছিল।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে সময়টা খাসোগি কনস্যুলেটের ভেতরে ছিলেন, সেই সময়টাতেই প্রায় ১৫ জন সৌদি লোক সেখানে ছিল। মঙ্গলবারই এই ১৫ জন বিমানে ইস্তাম্বুল পৌঁছায় বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।
তুর্কি-আরব মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান তুরান কিসলাকচি মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, তুর্কি পুলিশ সৌদি কনস্যুলেটের নিরাপত্তার জন্য বসানো সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করেছে এবং তাতে জামাল খাসোগি বেরিয়ে যাচ্ছেন এমন কিছু দেখা যায়নি। কিন্তু এ সময়ই কিছু কূটনৈতিক গাড?িকে কনস্যুলেটে ঢুকতে এবং বেরুতে দেখা গেছে।
সৌদি আরবে ‘এক ব্যক্তির শাসনের’ সমালোচক ছিলেন জামাল খাসোগি— বিবিসি
ইতিমধ্যেই খাসোগির অন্তর্ধান রহস্যের তদন্ত শুরু করেছেন তুরস্কের কর্মকর্তারা। একটি নিরাপত্তা দল ইতিমধ্যে ইস্তাম্বুল এসেছে। কিন্তু তাকে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে হত্যা করার কোনো প্রমাণ বা কীভাবে তাকে খুন করা হলো— এ ব্যাপারেও কোনো তথ্য দেনসি তুর্কি কর্মকর্তারা।
এর আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্লুমবার্গ নিউজকে বলেন, তুর্কি কর্তৃপক্ষ কনস্যুলেট ভবন তল্লাশি করতে পারে, এতে কোনো বাধা নেই।
সৌদি যুবরাজের সংস্কার পরিকল্পনা পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রশংসিত হলেও ভিন্নমতাবলম্বী, মানবাধিকার ও নারী অধিকারকর্মীদের দমন, বুদ্ধিজীবী এবং ধর্মীয় নেতাদের গ্রেফতার, ইয়েমেনের যুদ্ধ ইত্যাদি সমালোচিত হয়েছে।
তুরস্ক ও সৌদি আরবের সম্পর্ক এখন তিক্ত অবস্থায় আছে এবং একজন সুপরিচিত সৌদি ভিন্নমতাবলম্বীকে তুরস্কের মাটিতে রাষ্ট্রীয় মদদে হত্যার ব্যাপারটি প্রমাণিত হলে তা আরো বিরূপ হবে।
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এ ঘটনা সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টিও বলেছে, খাসোগির কী হয়েছে তা ব্যাপভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে বের করা হবে।
অন্যদিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও বলেছেন, খাসোগি একজন সৌদি নাগরিক এবং তার কী হয়েছে তা জানতে তিনি খুবই ব্যগ্র, তারা তুর্কি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
সৌদি যুবরাজ বলেন, ‘আমি যা বুঝতে পারছি তা হলো— তিনি (খাসোগি) কনস্যুলেটে ঢুকে আবার কয়েক মিনিট বা ঘণ্টাখানেক পরই বেরিযে যান, তবে আমি নিশ্চিত নই। আমরা তদন্ত করছি।’
তিনি আরো বলেন, কনস্যুলেট ভবন সৌদি আরবের নিজ ভূখণ্ডের মর্যাদা ভোগ করে, কিন্তু তদন্তকারীরা ভেতরে ঢুকতে চাইলে অনুমতি দেয়া হবে এবং তাদের কিছু লুকানোর নেই।
সৌদি আরবে খাসোগির নামে কি মামলা আছে— জানতে চাইলে যুবরাজ সালমান বলেন, তিনি কোথায় আছেন সেটাই তারা প্রথম জানতে জানতে চান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *