বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮, ১১:১৮:৫২ পূর্বাহ্ণ
Home » অর্থনীতি » ঋণের নামে ৩ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেল ক্রিসেন্ট

ঋণের নামে ৩ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেল ক্রিসেন্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাষ্ট্রীয় মালিকানার জনতা ব্যাংক থেকে ঋণের নামে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে ক্রিসেন্ট লেদার নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রধান কার্যালয় ও শাখা কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ব্যাংকের পুরান ঢাকার ইমামগঞ্জ শাখা থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অকাতরে ঋণ দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ব্যাংকের একক গ্রাহকের ঋণসীমার তিনগুণ ঋণ দেওয়া হয়েছে ক্রিসেন্ট লেদারকে।

চামড়াজাত পণ্য রফতানির নামে বিভিন্ন উপায়ে বিপুল অঙ্কের এ ঋণ নেওয়া হলেও আদৌ রফতানি হয়েছে কি-না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। অনিয়মের সঙ্গে জনতা ব্যাংকের বর্তমান এমডি, ডিএমডিসহ অন্তত ১০ কর্মকর্তা জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ক্রিসেন্ট লেদারের চেয়ারম্যান এম এ কাদের চামড়া খাতের অন্যতম ব্যবসায়ী।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে ৩৪৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। আরও ২০০ কোটি টাকা দেওয়ার চেষ্টা রুখে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রফতানির বিপরীতে ঋণের নামে বের করে নেওয়া এই অর্থের বড় অংশই পাচার হয়েছে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থ পাচারের তথ্য খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট ও শুল্ক্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর কাজ করছে।

বর্তমানে জনতা ব্যাংকের মূলধন ৪ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। নিয়ম অনুযায়ী এর সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ অর্থ কোনো একক গ্রাহককে ঋণ দেওয়া যায়। সে হিসাবে ক্রিসেন্ট লেদারকে সর্বোচ্চ এক হাজার ৫৮ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারে। কিন্তু ব্যাংক এ নিয়ম মানেনি। এর আগে জনতা ব্যাংক থেকে এননটেক্স নামের স্বল্প পরিচিত আরেকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার তথ্য উদ্ঘাটন হয়। একক গ্রাহকের ঋণসীমা অতিক্রম করে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়ার ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশের পর নানা সমালোচনার মুখে রয়েছে জনতা ব্যাংক। এর আগে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে বিসমিল্লাহ গ্রুপ যে ১১শ’ কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়েছে তার ৩৩৩ কোটি টাকা ছিল জনতা ব্যাংকের।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ক্রিসেন্ট লেদারের এফডিবিপির অনিয়ম বিষয়ে সমকালে ‘হাজার কোটি টাকা দিয়ে বিপদে জনতা ব্যাংক’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে শাখার ৬ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত বিষয়ে আরও একটি প্রতিবেদন ২৬ মার্চ প্রকাশিত হয়।

ক্রিসেন্ট লেদারের অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার দায়ে ব্যাংকটির বর্তমান এমডি আবদুছ ছালাম আজাদকে অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন ব্যাংকটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক। সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এমডিকে অপসারণের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকটির ডিএমডি মোহাম্মদ ফখরুল আলমকে সব ধরনের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ নির্দেশনার পর গত ২২ মার্চ এক আদেশের মাধ্যমে ফখরুল আলমকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের ৮ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তারা হলেন- ইমামগঞ্জ শাখার (পরিদর্শন চলাকালীন) ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইকবাল (ডিজিএম), এর আগে ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালনকারী রেজাউল করিম (মহাব্যবস্থাপক), সর্বশেষ শাখা ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালনকারী একেএম আসাদুজ্জামান (ডিজিএম), শাখার সেকেন্ড অফিসার আতাউর রহমান (এজিএম), সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মগরেব আলী, সিনিয়র অফিসার মনিরুজ্জামান, অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন ও সাইফুজ্জামান। অধিকতর তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, একক প্রতিষ্ঠানকে এত টাকা দেওয়া অস্বাভাবিক। একক গ্রাহকের ঋণসীমা অতিক্রম করে জনতা ব্যাংক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট তদন্ত করে দেখতে পারে এ অর্থের সদ্ব্যবহার হয়েছে কি-না। এর পর দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট লেদারের মালিকানাধীন ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্ট, রূপালী কম্পোজিট লেদার ওয়্যারস, ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ, রিমেক্স ফুটওয়্যার এবং লেক্সকো লিমিটেড নামের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান থেকে চীন, ইতালি, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশে রফতানি দেখানো হয়। এসব রফতানির বিপরীতে সৃষ্ট ফরেন ডকুমেন্টারি বিল ক্রয় (এফডিবিপি) করে জনতা ব্যাংক। গত ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শনে নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে এফডিবিপির বিপরীতে এক হাজার ১৩৫ কোটি টাকা দেওয়ার তথ্য উঠে আসে। রফতানির ১২০ দিনের মধ্যে এসব বিলের অর্থ ফেরত আনার নিয়ম থাকলেও ক্রিসেন্টের ক্ষেত্রে তা আসেনি। গত বছরের এপ্রিল থেকে ধারাবাহিকভাবে রফতানির অর্থ না এলেও বিল কেনা বন্ধ করেনি ব্যাংক। এভাবে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৭০টি বিল কিনেছে জনতা ব্যাংক। এ তথ্য উদ্ঘাটনের পর নতুন করে কোনো বিল না কেনার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে পুরনো দায় সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে চাতুর্যের আশ্রয় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পরও ১৭২টি বিলের বিপরীতে ক্রিসেন্ট লেদারকে ৩৪৩ কোটি ১১ লাখ টাকা দেয় ব্যাংক। এই অর্থ থেকে ১৪৭ কোটি টাকার দায় সমন্বয় করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেখানো হয় ওই পরিমাণ রফতানির অর্থ দেশে এসেছে। পরে বিভিন্ন তথ্য বিশ্নেষণ করে ব্যাংকের দেওয়া তথ্য সঠিক নয় বলে জানতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানা গেছে, ক্রিসেন্ট লেদারের অনিয়মের বিষয়ে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কয়েকটি সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ব্যাংকটির ৫০৫, ৫০৬, ৫১৫ ও ৫১৬তম পর্ষদ সভার মূল এজেন্ডা ছিল ক্রিসেন্টের ঋণ। প্রতিষ্ঠানটির নামে সৃষ্ট ঋণের মধ্যে ফরেন ডকুমেন্টারি বিল ক্রয়ের (এফডিবিপি) বিপরীতে দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। রফতানি কার্যক্রমের জন্য চলমান ঋণ (সিসি) হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৮১৫ কোটি টাকা। রফতানির কাঁচামাল কেনার জন্য সৃষ্ট ব্যাক টু ব্যাক এলসি তথা পিসি বা পিকিং ক্রেডিটের বিপরীতে দেওয়া হয়েছে ৫০২ কোটি টাকা। আর রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তা হিসেবে অগ্রিম ৯৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এভাবে মোট দুই হাজার ৯৬০ কোটি টাকা দিয়েছে জনতা ব্যাংক। এর মধ্যে ১৪৭ কোটি টাকা সমন্বয়ের পর বর্তমানে পাওনা দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। যদিও প্রকৃত পাওনার পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্নিষ্টদের ধারণা।

সব মিলিয়ে জনতা ব্যাংকে কী পরিমাণ দেনা রয়েছে জানতে চাইলে ক্রিসেন্ট লেদারের চেয়ারম্যান এমএ কাদের গতকাল বলেন, সব কিছু সময় নিয়ে হিসাব করে বলতে হবে। তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের সময় তিন-চার মাস কারখানা বন্ধ ছিল। তখন বিদেশি ক্রেতাদের যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় কিছু সমস্যা হয়েছে। তবে সব টাকা ফেরত আসবে। এ জন্য তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে সমকালে তার প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনিয়মের প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, দু-একদিনের মধ্যে বেশ কিছু অর্থ ফেরত আসবে। এরপর কোনো অর্থ এসেছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসছে, আসবে। এটা চলমান প্রক্রিয়া।’

গত কয়েকদিনে চেষ্টা করেও জনতা ব্যাংকের এমডি মো. আবদুছ ছালাম আজাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে এ-সংক্রান্ত রিপোর্ট করার সময় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেন, ক্রিসেন্ট লেদারের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে ব্যাংক ব্যবস্থা নিচ্ছে। এরই মধ্যে ওই শাখার কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আরও কিছু ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। বিপুল অঙ্কের বিল বকেয়া থাকার পরও নিয়ম লঙ্ঘন করে নতুন বিল কেনার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, পদ্ধতিগত কারণে ধাপে ধাপে বিলগুলো কিনতে হয়েছে।

জানা গেছে, হংকংয়ের বায়ো লিডা ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৫০ ডলারের চামড়াজাত পণ্য রফতানি দেখানো হয় গত বছরের ২৭ এপ্রিল। নিয়ম অনুযায়ী, রফতানি হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে ওই অর্থ দেশে আনা বাধ্যতামূলক। আর অর্থ না এলে উপযুক্ত কারণ দর্শানো ছাড়া রফতানিকারককে কোনো ঋণ সুবিধা বা তার বিল কেনা যাবে না। তবে ক্রিসেন্ট লেদারের অর্থ দেশে না এলেও একের পর এক বিল কিনেছে জনতা ব্যাংক, যা ব্যাংকিং আইন-কানুনের লঙ্ঘন।

ক্রিসেন্ট লেদারের চেয়ারম্যান এমএ কাদেরের নামে বর্তমানে কোম্পানির শেয়ার রয়েছে ৫০ শতাংশ। তার মা রিজিয়া বেগম এ গ্রুপের পরিচালক। স্ত্রী সুলতানা বেগম এমডি। এ দু’জনের নামে রয়েছে ২৫ শতাংশ করে শেয়ার। তবে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এক আবেদনের মাধ্যমে রিজিয়া বেগমের নামে থাকা ২৫ শতাংশ শেয়ার চেয়ারম্যানের স্ত্রীর নামে স্থানান্তরের কথা বলা হয়। কোনো ঋণগ্রহীতার শেয়ার হস্তান্তর করতে হলে ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন পাঠানো হলে তা নাকচ হয়ে যায়। এর আগে বিসমিল্লাহ গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার আগে একই প্রক্রিয়ায় শেয়ার হস্তান্তর করেছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ঋণ অনিয়মের তথ্য উঠে আসার পর গত ২১ জানুয়ারি এফডিবিপি কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক করে জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। সব শাখায় পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়, রফতানি বিল কেনার ক্ষেত্রে এখন থেকে প্রধান কার্যালয়ের অনুমতি নিতে হবে। প্রতিটি বিলের চুক্তির সঠিকতা যাচাইসহ বিদেশি ক্রেতার সন্তোষজনক ক্রেডিট রিপোর্ট ছাড়া বিল কেনা যাবে না। চুক্তিপত্রের বিপরীতে এরই মধ্যে কেনা কোনো বিল মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে পরবর্তীকালে ওই গ্রাহকের আর কোনো বিল কেনা যাবে না। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এ নির্দেশনার পরও ক্রিসেন্ট লেদারের বিল কেনা থেমে থাকেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *