মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৭, ২:০৭:৪৯ অপরাহ্ণ
Home » পর্যটন » অচেনা চরে খিচুড়ি খাওয়ার নিমন্ত্রণ

অচেনা চরে খিচুড়ি খাওয়ার নিমন্ত্রণ

চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুর মজু চৌধুরীর ঘাট কতক্ষণ সময় লাগবে জানি না। এক জনের কাছে জানতে চাইলে একবার বলে তিন ঘণ্টা আরেকবার বলে পাঁচ ঘণ্টা। এমনিতেই অনেক ধকল গেছে, এসব যাচাই করে লাভ নেই। তার চেয়ে বরং বাসে উঠে একটা ঘুম দেয়ার কথা ভাবা যাক। বাহির থেকে ঝকঝকে দেখালেও বাসের ভেতরটা লম্বা ভ্রমণের জন্য অনুপযোগী। মহানগরের ভিড়ভাট্টার পর ফাঁকা সড়ক পেয়ে বাস বাঘের গতিতে এগিয়ে চললো। রাত সোয়া দুইটায় আমাদের নামিয়ে দেয়া হলো ঘাটে।

অপেক্ষারত লঞ্চে উঠে আসন দখল করে বসে পড়লাম। একশ বা একশ বিশ টাকা ভাড়া। লঞ্চের মাঝখান দিয়ে এমাথা-ওমাথা লম্বা চলার পথ, দুই পাশে হেলান দেয়া টানা আসন পাতা। ঠান্ডা বাতাস যাতে না ঢুকতে পারে সে জন্য চারপাশের সমস্ত পর্দা নামিয়ে দেয়া হলো। একি! কবুতরের খোপে আটকানো হলো নাকি? চোখের সামনে ভেসে উঠল পদ্মার অতলে হারিয়ে যাওয়া লঞ্চ পিনাকীর কথা। কীভাবে টুপ করে উল্টে গিয়েই হারিয়ে গেল। সেই যে হারিয়ে গেল আজ পর্যন্ত সন্ধান মিললো না। লঞ্চ ছেড়ে দিলো। চারদিকে দেখছি আর ভাবছি পিনাকীর মতো দশা হলে কোন দিকে দিয়ে এই বদ্ধ লঞ্চ থেকে বের হওয়া যেতে পারে আর ভেসে থাকার অবলম্বনই বা কী হবে ইত্যাদি। এমন সব ভাবনা ছাপিয়ে দুচোখ ভরে ঘুম চলে এলো। বিশ মিনিটও হয়নি তর্জন-গর্জন ধরনের এক কণ্ঠের কারণে তন্দ্রা কেটে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে এক বুজুর্গানে দ্বীন ওয়াজ পেশ করছেন। ধর্মীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য দান-খয়রাত সংগ্রহের ওয়াজ। রাত বাজে সাড়ে তিন কি চারটা, লঞ্চ মাঝ নদীতে আর তিনি টাকা তুলছেন। যারা এই ধরনের কাজের সাথে যুক্ত তাদের কণ্ঠ সাধারণত সুরেলা এবং সম্মোহনী ক্ষমতাসম্পন্ন হয়। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে সম্মুখে যা পরিবেশিত হচ্ছে তার মতো উচ্চমার্গের কণ্ঠ জীবনে শোনা হয়নি। পাশের যাত্রীকে একা একা বলতে শুনলাম- হুজুরকে এক ঘটি আদা চা খাওয়ানো দরকার।

ঘুম পালালো, আবার নানা কিছু ভাবছি। কেমন করে নামব, নেমে কোথায় যাব? না! হুজুরের বয়ানের কারণে সমস্ত ভাবনার জাল পটাশ পটাশ করে ছিঁড়ে যাচ্ছে। খুব অস্বস্তি লাগছে। ভাবছি তিনি একটু কাশছেন না কেন? কণ্ঠনালীতে ঘন কাশের যে পর্দা লেপ্টে বসে আছে একটা কাশি দিলেই অপসারিত হয়ে যায়- বিলক্ষণ তার সেদিকে মনোযোগ নেই। যাই হোক, হুজুরের কণ্ঠ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করতে ইচ্ছে হলো না। যদিও চাইলে এ কাজে পাশে বসা যাত্রীর সহযোগিতা পেতাম নিশ্চিত। কিন্তু তার আগেই রাতের নীরবতা ভেস্তে গেল ভোরের কোলাহলে। পৌঁছে গেছি ইলিশা ঘাটে। এখান থেকে যেতে হবে ভোলা সদর। যাত্রীর চেয়ে গাড়ির সংখ্যা বেশি। ছাউনি দেয়া ভটভটি, গুনে শেষ করা যাবে না। কুয়াশায় দুচোখে কিছু দেখা যায় না। চেহারা দেখে ইচ্ছা মতো ভাড়া চেয়ে বসায় সমনে কিছুটা হেঁটে গিয়ে একটাতে উঠে পড়লাম। ইঞ্জিনের কাছের আসন, কানের তালা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। এরপর ভোলা থেকে বাসে চরফ্যাশন। চরফ্যাশন থেকে আর অন্য কোনো বাহন নায়। মোটর সাইকেল ভাড়া করে এক টানে পরবর্তী ঘাট।

নৌকা ঘাটে এসে ভিড়ল। মালামাল নামানোর পর আবারও ছেড়ে যাবে। সেই একই চিত্র- শ্রমিকরা ইলিশ এবং অন্যান্য মাছের বড় বড় খাচি টেনে নামাচ্ছে। ইলিশের খাচি অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা, বিশেষ মাছ বলে কথা। সকলের মুখে সমস্বরে ধ্বনি তৈরি হচ্ছে- হেইয়ো, হল নারে, আরও জোরে, মারো ঠেলা, জোর লাগিয়ে, হেইয়ো…। খাচি ভর্তি জাতীয় মাছ ইলিশ, এখন যার দাম হিরা-জহরতের কাছাকাছি! আর খাওয়া? সে তো স্বপ্ন সমতুল্য। চালান হচ্ছে ঢাকাসহ বড় বড় শহরে। তাছাড়া, দুই মাস পরেই রয়েছে জাতীয় উন্মদনার পহেলা বৈশাখ। সে জন্য মুনাফাখোরদের জিহ্বা এখন থেকেই লাল হয়ে আছে, টনকে টন ইলিশ মজুদ হচ্ছে। যাত্রী ওঠা শুরু হলো। যথারীতি জায়গা করে নিলাম ছাউনির ওপরে সর্ব পেছনের উঁচু জায়গাটায়। এখান থেকে চারপাশ ভালো দেখা যায়। ছবি তোলার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা এটা। পরিচিত জয়গা, পৌঁছেই ফোন করলাম মাঝি বাবুল কাকাকে। তিনি গতবার নতুন চরে যাওয়া নৌকার মাঝি ছিলেন। তিনি নেই, কয়েকদিন হলো পটুয়াখালী আছেন। এখন উপায়? আমাদের কে নিয়ে যাবে নতুন চরে? বাজারে শরীফ চাচার দোকন আমাদের ঠিকানা। সালাম দিতেই চিনতে পারলেন এবং ব্যস্ত হলেন। ফোকলা মুখে হেসে বললেন, আগে চা তারপর কথা। আগের বার বাবুল কাকাকে তিনিই ঠিক করে দিয়েছিলেন। পটুয়াখালী গেছে তো কী হয়েছে, চিন্তা নেই ভাতিজা সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ফোন লাগালেন আব্দুল বাশার মাঝিকে। আলাপ শেষে ফোন রেখে বললেন, ভাতিজারা থাকার জায়গায় গিয়ে ব্যাগ রেখে গোসল করে বিশ্রাম করেন। তারপর সন্ধ্যায় চলে আসেন বাশারের সাথে কথা বলিয়ে দেব। বিশ্রাম শেষে শরিফ চাচার দোকানে গিয়ে দেখি বাশার মাঝি হাজির। সমস্যা বাঁধল ভাড়া নিয়ে। দুই হাজারের নিচে সে যাবে না বলে বগলের নিচে হাত ঢুকিয়ে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। দরদাম করতে চাইলে বলল, এমন জায়গায় এই বাশার ছাড়া কারও ক্ষমতা নেই যায়! এরপর আবারও সেই আগের ভঙ্গিমায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বলে-কয়ে শরিফ চাচা আঠারশতে সই করে দিলেন।

ভোরে ঘাটে গিয়ে দেখি বাশার মাঝি নৌকা নিযে অপেক্ষা করছে। সে নিজ নামের উচ্চারণে ‘ব’ এর পর আকারটা ফেলে দিয়ে উচ্চারণ করে- বশার। কিছু জানতে চাওয়ার আগেই বলে, বশারের কথা যা কাজ তাই। আপনাদের জন্য বেলা ওঠার আগ থেকে বসে আছি। নৌকা তার জবর বটে, হালের জায়গায় গোল স্টিয়ারিং লাগানো। এমন আবিষ্কার দেখে আমরা মুগ্ধ! নৌকা ছেড়ে দিলো দক্ষ মাঝি বশার। কনকনে শীতে তার সারা গায়ে গরম কাপর নেই কিন্তু মাফলার দিয়ে কান-মাথা কষে টেনে বাঁধা। ভাটায় জেগে আছে সবুজ ঘাসের জমিন। লম্বা গলার ধবধবে সাদা বকের ঝাঁক ঠায় দাঁড়িয়ে, যেন শীতে জমে গেছে। অল্প ব্যাবধানে ফটফট শব্দে নৌকা যায় অথচ কোনো বিকার নেই। মাঝি চিৎকার দিয়ে উ উ উ…ঠাস শব্দ করলে অলস ভঙ্গিমায় উড়ে গিয়ে গোল একটা চক্কর দিয়ে আবার একই জায়গায় এসে বসে। খানিক দূরে গিয়ে চোখে পরে খয়েরী, হলুদ এবং সাদা রঙের মিশ্রণে হাঁসের মতো দেখতে অতি চমৎকার পাখি। অতিথি পাখি হতে পারে। তবে এরা একটু বেশি সংবেদনশীল বকের মতো নয় যে, মেশিনের শব্দেও নির্লিপ্ত বসে থাকবে। চারিদিকে এখন শুধু পানি, পশ্চিমে আবছা কালো রেখার মতো দেখা যায় আরেক চর। আমরা মুগ্ধ হয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করছি তো বশার মাঝি তার বীরত্বগাথাজুড়ে দিচ্ছে। অধিকন্তু, আই কন্টাক্ট নিশ্চিত করে শুনতে মনোযোগী হতে বাধ্য করছে। যেন নতুন চর নামক কোথাও নয় ভিন্ন কোনো গ্রহে সে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে।

কয়েক ঘণ্টা পর গন্তব্য এখন আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান। স্টিয়ারিং ধরার ইচ্ছা প্রকাশ করায় বলল, আগে বলবেন না? আমি থাকতে কোনো সমস্যা নেই। এ প্রসঙ্গেও এক দিস্তা বীরত্বগাথা শ্রবণ করতে হলো। সুজিৎ স্টিয়ারিং ছেড়ে উঠবে না, চালিয়ে নিল চরের প্রায় কাছাকাছি পর্যন্ত। সৈকতের মতো মসৃণ বালুকাবেলার পর ঐ দূরে ঝাউবনের দীর্ঘ সারি। পা রাখলাম নতুন চরে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত অর্জনের এক ফুরফুরে অনুভূতি বয়ে গেল। প্রতিকুল আবহাওয়ার কারণে আগস্টে মাঝপথ থেকে মনে বড় কষ্ট নিয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। দ্বিতীবারের চেষ্টায় পৌঁছেই গেলাম। এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতির কোনো ধারণা আমাদের নেই। সামনে ঝাউবন তার পেছনে অরণ্য। কি কি প্রাণী আছে, মানুষের বসবাস আছে কি না কিছুই জানা নেই। আমাদের মতো কেউ আসে কিনা তাও জানা নেই। মনের ভেতর এখন অনেক প্রশ্ন আর কৌতূহল। সব মিলিয়ে নিজের মধ্যে এক ধরনের কলম্বাস কলম্বাস ভাব জাগ্রত হতে চাচ্ছে। অমনি কর্ণকুহরে এসে প্রবেশ করে দূরবর্তী এক মাইকের শব্দ। কাছে যেতে যেতে তা আরও স্পষ্ট হলো। বাজছে হিন্দি গান- উলালা উলালা…। শুনে আমি যেন অনেক উঁচু থেকে ধপাস করে মাটিতে পরলাম। আমার ভেতরের কলম্বাস লুলা ল্যাংরা কিছু একটা হয়ে গেল।মেজাজ এতটাই খারাপ হলো যে, পরিবেশের সাথে বিরুদ্ধাচারণকারীদের সাথে একটা যুদ্ধই বাঁধিয়ে ফেলব! সুজিৎ ছবি তোলা বাদ দিয়ে অস্ত্র হাতে জোর কদমে এগিয়ে চলছে। ইংরেজি ওয়াই আকৃতির পোড়া ডালটা ওর হাতে ভালোই মানিয়েছে। কে জানে কোথা থেকে ভেসে এসেছে। পুড়ে না গেলে হয়তো মাটি থেকে সাঁই করে হাতে তুলে মাথার উপর ওভাবে ঘুরাতে পারতো না। যতই নিকটে যাচ্ছি মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। পেছনে তাকিয়ে দেখি বশার তার ছোট্ট সহযোগীসহ এগিয়ে আসছে। তাতে আমাদের গতি আরও বেড়ে গেল। ওদিকে বালির পড়তে পা দেবে গিয়ে সুজিৎ খানিকটা কাহিল। মাইকের শব্দ অনুসরণ করে ঝাউবনের মাঝ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। গান পরিবর্তন হয়ে এখন বাজছে- তু খিচ্ মেরি ফোটো। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা দিল ডেকোরেটরের রঙিন কাপড়ে চারপাশ ঘেরা সামিয়ানা এবং সেটাকে কেন্দ্র করে একদল যুবকের সমাগম। এখন বোধহয় হাতের ডাল ফেলে দিয়ে নিজেদের মূর্তিতে খানিকটা পরিবর্তন আনা উচিৎ। এবার কানের চেয়ে হঠাৎ নাসিকাজোড়া অধিক সজাগ হয়ে উঠল। জঙ্গলের ফাঁক গলে ভুরভুর করে মাংস খিচুড়ির সুঘ্রাণ আসছে! ভাত খেয়েছি সেই গতকাল সন্ধ্যায় এখন বেলা প্রায় দশটা। ঠিক আছে, রণনীতি আগেরটাই থাকবে, কেবল কৌশলে একটু পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থাৎ খাতির জমিয়ে মাংস খিচুড়িতে নাস্তাটা সেরে নেয়া এবং তারপর পরিবেশ সচেতনতামূলক কিছু বক্তৃতা প্রদান, ব্যাস। আমাদেরকে দেখেই তারা সাদরে আমন্ত্রণ জানাল এবং সে সাথে মিলে গেল খিচুড়ি খাওয়ার নিমন্ত্রণ।

 

ডিটিবাংলা/ ০৪ অক্টোবর ২০১৭/আর.এ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *